‘সেলফ নেগলেন্সির কারনে মাদকাসক্তরা করোনার উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে’- ডা. পলাশ রায়

শাহরিয়ার সোহেল চৌধুরী: ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মনোরোগ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. পলাশ রায় বলেছেন, ‘সেলফ নেগলিসেন্সির কারনে তথা নিজেদের সুস্থ-স্বাভাবিক জীবনযাপনের ক্ষেত্রে অনীহা ও উদাসীনতার কারনে মাদকাসক্ত ব্যক্তিরা করোনা সংক্রমনের উচ্চ ঝুঁকি বহন করেন।’ আজ রবিবার ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের মনোরোগ বিভাগে অনলাইন নিউজ পোর্টাল ‘দীপ সমাচার’-এর সাথে এক লাইভ সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন। পুরো সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেন ডিএসএমবিডি২৪ ডট কমের সম্পাদক এবং দীপ মানসিক ও মাদকাসক্ত চিকিৎসা পুনর্বাসন কেন্দ্রের চেয়ারম্যান আরিফ সিদ্দিকী সুমন

মাদকাসক্ত ব্যক্তি করোনা স্প্রেডার হিসাবে কতটা ঝুঁকিপূর্ণ এরকম প্রশ্নের জবাবে ডা. পলাশ রায় বলেন, ‘মাদকাসক্ত যারা তাদের সেলফ নেগলেন্সি বেশী। তারা নিজের প্রতি যতœ কম নেন, নিজের প্রতি তাদের উদাসীনতা থাকে বেশী। বেশীরভাগের ক্ষেত্রেই তাদের খাবার-দাবারের ঠিক  থাকে না। জীবনযাপনের ক্ষেত্রে হেলদি লাইফ স্টাইল তারা লিড করে না। যার কারনে তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম। ড্রাগসের ব্যবহারের কারনে তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। যেহেতু তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম সেহেতু তারা খুব সহজেই করোনা ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হবার উচ্চ ঝুঁকি বহন করেন।’ মাদকাসক্তরা বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই একত্রে দলবেঁধে মাদক গ্রহন করেন এই বিষয়টি উল্ল্যেখ করে ড. পলাশ বলেন, ‘মাদকাসক্তদের মধ্যে সোশ্যাল ডিসটেন্সি কম থাকে। যে কারনে করোনা আক্রান্ত মাদকাসক্তরা একজন থেকে আরেকজনের মধ্যে ভাইরাস বেশী ছড়াতে সক্ষম। সব মিলিয়ে অবশ্যই মাদকাসক্তরা করোনা স্প্রেডার হিসেবে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ।’ তিনি বর্তমান পরিস্থিতিতে সারাবিশ্বেই যখন সবার মাঝেই প্রবল হতাশা বিরাজ করছে তখন মাদকাসক্তরা সেই হতাশা থেকেও বেশী বেশী ড্রাগস গ্রহন করতে আগ্রহী হবে বলে  আশঙ্কা প্রকাশ করেন। কারন মাদকসেবীরা চাপ থেকে মুক্তি পাবার জন্য ড্রাগসের আশ্রয় বেশী বেশী গ্রহণ করে থাকে। ফলে তারা ক্রমেই আরও ঝুঁকির সম্মুখীন হয়ে পড়বে।

Dip Add

স্টে হোম, লকডাউন, ও হোম কোয়ারিন্টিনে থাকার ফলে কর্মজীবি ও বর্হিমূখী মানুষের মনের উপর কি ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে সেই বিষয়ে জানতে চাইলে এই মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘সারা পৃথিবী এখন একটা ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। কোভিড-১৯ ভাইরাসে ইতিমধ্যে সারা পৃথিবীতে ৭ লক্ষ লোক আক্রান্ত হয়েছে। মারা গিয়েছে প্রায় ৩০ হাজারেরও বেশী মানুষ। সারা পৃথিবীতেই এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে, যে কারনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা করোনাকে মহামারি হিসেবে ঘোষণা করেছে। বাংলাদেশেও গত ৮ মার্চ প্রথম করোনা ভাইরাস আক্রান্ত রোগী সনাক্ত হয়েছে। আজকে পর্যন্ত ৫১ জন রোগী সনাক্ত হয়েছে। গত তিনমাস ধরে বিশ্বজুড়ে করোনা ভাইরাসের সংক্রমনের গতি-প্রকৃতি যদি আমরা দেখি তাতে দেখবো লক ডাউনের মাধ্যমে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ করোনার সংক্রমনের ভারী হারটাকে কমিয়ে রাখতে পেরেছে। বাংলাদেশেও এখন লকডাউন পরিস্থিতি চলছে। যেহেতু বাংলাদেশে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ বসবাস করে থাকেন এবং লকডাউনে তাদের সবার সমস্যার ধরন এক না। ’

তিনি বলেন, ‘লকডাউনের কারনে যেহেতু মানুষজনকে ঘরে বসে থাকতে হচ্ছে তার ফলে মানুষজনের নানান মানসিক সমস্যাও দেখা দিতে পারে। এর আগে পৃথিবীতে  যেসব মহামারী এসেছিলো, মহামারীর পরের সময়টায় গবেষণাতে দেখা গেছে যে, বিরুপ পরিস্থিতিতে বিশাল সংখ্যার মানুষ বিষন্নতায় আক্রান্ত হয়েছে। বিশাল অংকের মানুষ পোষ্ট ট্রমাটিক স্পেস ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত হয়েছিলেন। পাশাপাশি যেহেতু ঘরে বসে থাকতে হবে, ঘরে বসে থাকার কারনে যে একটা প্রচন্ড মানসিক চাপের মধ্যে দিয়ে থাকতে হচ্ছে বর্তমানে মানুষজনকে, নিজে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা, নিজেকে সেইভ করার পাশাপাশি বাসাবাড়ীর অন্যকেউ আক্রান্ত হলো কি না, নিজের আত্মীয়-স্বজন আছে, বয়োজৌষ্ঠ ব্যক্তিরা আছে তাদেরকে সেইভ করার একটা প্রেশারও থাকে মানুষজনের মধ্যে। পাশাপাশি ভবিষ্যত কি হবে এই নিয়েও তারা দুশ্চিন্তায় থাকে, কারন বেশীরভাগ মানুষই দিন আনে দিন খায় এইরকম অবস্থা। যদি তাদেরকে এক মাস, দু’মাস ঘরে বসে থাকতে হয় করোনার কারনে তাহলে ভবিষ্যতটা কি হবে?, বাচ্চাদের স্কুলের কি হবে?, চাকরির কি হবে?, এই চিন্তাগুলার কারনে বাংলাদেশের মানুষজন একটু মানসিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকিতে অবশ্যই আছে।’ তিনি খুব কাছাকাছি সময়ের মসধ্যে করোনা ভইরাসের যে সংক্রমনকে জয় করার বিষয়ে আশাবাদ ব্যাক্ত করে আরোও বলেন, ‘আমরা যুদ্ধ করছি এখন। কিন্তু মানুষের মনে করোনা ভাইরাসের কারনে এই সময়ের যে একটা ছাপ থেকে যাবে এটা দূর করার জন্য আমাদের অবশ্যই কাজ করে যেতে হবে।’

করোনা ভাইরাসের কারনে সৃষ্ট ভীতিরোগ বা প্যানিক কাটাতে জনসাধারনকে সরকারের নির্দেশিত নিয়মাবলী বেশী বেশী অনুসরন করার উপর ড. রায় জোর দেন। তিনি বলেন, ‘নিজে  বাঁচুন, নিজে সেইভ থাকুন, অন্যকে সেইভ করুন এটাই হচ্ছে এখন সবচেয়ে বড়কথা। এই সময়টাতে মানসিক অবসাদ বলেন, হঠাৎ রেগে যাওয়া, তারপর অতিরিক্ত ভীতি এইসব কমন উপসর্গ। এইসবের পাশাপাশি এই সময়টাতে মানুষজনের মধ্যে দেখা গেছে ধূমপান বা এই ধরনের অন্যান্য মাদক যেসব আাছে সেগুলো গ্রহণের প্রবণতা বেড়ে যায়।’ এইসব ক্ষেত্রে ভীতি দূর করার জন্য ডা. পলাশের পরমার্শ হলো প্রথমেই সবাইকে সত্য ও প্রয়োজনীয় তথ্য গ্রহণ করতে হবে। জনগন যেসকল তথ্য বা ইনফরমেশন গ্রহন করবে তা কতটুকু অর্থেনটিক, সেইসব তথ্যের গ্রহণযোগ্যতা সর্বাগ্রে যাচাই করে নিতে হবে। মোটকথা যে জায়গা থেকে তথ্যটা নেওয়া হবে তার সোর্সটা কতটুকু অর্থেনটিক তা আগে যাচাই করে নেওয়ার জন্য তিনি সকলের প্রতি অনুরোধ করেন। এর কারন হিসেবে তিনি বলেন, ‘এসময়টায় অনেক ধরনের গুজব ছড়াচ্ছে আর এইসব গুজবের কারনে আমাদের মাঝে প্যানিকও অনেক বেশী হচ্ছে।  দ্বিতীয়ত হলো আমরা সবাই যেহেতু ঘরে বসে আছি, সবাই মিলেমিশে আছি, সবাইকে তাই সবাই মিলে এ্যাসিওরেন্স করার বিষয় আছে। আপনারা জানেন করোনায়  যারা ইতিমধ্যে আক্রান্ত হয়েছেন তাদের বেশীরভাগই সুস্থ হয়ে গেছেন। সারা পৃথিবীতে করোনা আক্রান্তদের মধ্যে মাত্র ৫% মানুষ উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ  বিবেচেনায় আইসোলেশনে গিয়েছেন। বাদিবাকিরা কিন্তু সুস্থ হয়ে  বাড়ী ফিরেছেন। আমরাএই ইতিবাচক তথ্যটাই জনগনের মাঝে এনশিওর করতে পারি।’ তাঁর মতে প্রথম বিষয়টা হলো প্রতিরোধ, আর সঠিক প্রতিরোধে  আক্রান্তের ক্ষেত্রে রিস্ক কমে যায়। যদি কেউ আক্রান্ত হয়েই যায় তার কিন্তু সুস্থ হয়ে যাবার সম্ভাবনাও বেশী থাকে, মৃত্যূর সম্ভাবনা খুবই কম। আর এই বিষয়টাতেই তিনি সবাইকে বেশী করে জোর দিতে বলেন।

করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের সদস্যদের মানসিক শক্তি বৃদ্ধিতে কি করা উচিত এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘যেহেতু করোনায় এখন অবধি সুস্থ হয়ে যাবার পরিমান বেশী ও মৃত্যূর সম্ভাবনা কম, তাই প্রতিরোধেই মুক্তি। আর এই তথ্যগুলো  এনশিওর করতে হবে বেশী বেশী করে। তারমতে এই সময়টায় সরকারীভাবে বিভিন্ন নির্দেশনাগুলো সঠিকভাবে মেনে চলতে হবে। ফ্যামেলি মেম্বার যারা তাদের ক্ষেত্রে  সুস্থ থাকার জন্য এই সবাই মিলে খুব বেশী হেলদি লাইফ স্টাইল লিড করতে হবে। যেমন- পরিমিত ঘুম, সুষম খাবার, হালকা ব্যায়াম, অবসরে যে যে কাজগুলো পছন্দনীয়, যেমন- বই পড়া, টেলিভিশন দেখা, পরিবারের যারা কাছাকাছি আছে তারা পরষ্পর কোয়ালিটি লাইফ পাস করা ইত্যাদি করতে হবে। এছাড়া যারা দূরে আছে সেইসব বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজনদের সাথে মোবাইল বা ইন্টারনেটে যোগাযোগ বাড়ানোরও পরামর্শ দেন তিনি।

স্টে হোম চলাকালীন সময়ে মাদকাসক্ত চিকিৎসা কেন্দ্রগুলো করনীয় সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘যেইসব প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে থাকে সেই সকল সমস্ত প্রতিষ্ঠানের জন্যই বাংলাদেশে সরকার একটি নির্দেশনা দিয়েছে। মাদকাসক্ত পূণর্বাসন কেন্দ্রগুলোও এর বাইরে নয়। তাই প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠানেরই উচিত সরকারের দেওয়া নির্দেশনা মেনে চলা।‘ যেহেতু মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রগুলোতে মাদকাসক্তরা চিকিৎসা নিয়ে থাকেন এবং মাদকাসক্তরা নিজের বিষয়ে উদাসীন ও তাদের রিস্কও বেশী তাই কেন্দ্রগুলোতে করোনা প্রতিরোধের ক্ষেত্রে যেসকল ঝুঁকিগুলো থাকে তা নিয়ে রোগীদের সাথে বেশী করে আলোচনা করার পরামর্শ দেন ডা. পলাশ। এক্ষেত্রে তিনি বারবার হাত ধোয়, পরষ্পর নির্ধারিত দূরত্ব রাখা, হাঁচি-কাশি দেওয়ার ক্ষেত্রে কনুইয়ের ভাঁজ, টিস্যূ, রুমাল ব্যবহার, ব্যবহৃত ভিনেগার, ডিসপোজাল ইত্যাদি ফেলে দেওয়া এসবকল বিষয়ে কেন্দ্রগুলোকে সজাগ থাকতে পরামর্শ দেন। তবে ডা. পলাশ রায়ের মতে এ সময়ে সবচেয়ে বেশী জরুরী হলো, কেন্দ্রগুলোতে বাইরে থেকে যখন রোগীদের সাথে কেউ দেখা করতে আসবেন তাদের বিষয়টা যথাসম্ভব রেস্ট্রিক্ট করা। এক্ষেত্রে মোবাইল কলে, ভিডিও কলের মাধ্যমে দেখা করানো, কথা বলিয়ে দেওয়া যেতে পারে। আগে অভিভাবকরা যেমনে ফ্রিলি দেখা করতে পারতেন এখন পরিবর্তিত সময়ে তা নিয়ন্ত্রণ করা উচিত বলেও তিনি মত দেন। এছাড়া তিনি রোগীদের এই সময়ে ফিজিক্যালি বুষ্ট আপ করার জন্য প্রতিদিন ব্যায়াম করানো, সুষম খাবারের ব্যবস্থা করা, নতুন রোগীদের ভর্তির ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন করা ইত্যাদি পরামর্শও দেন।

সম্পূর্ণ সাক্ষাৎকারটির ভিডিও দেখতে নীচের লিঙ্কটিতে ক্লিক করুন-

ডাঃপলাশ রায় (মনোরোগ বিশেষজ্ঞ) এর করোনা ভাইরাস সমষ্যা নিয়ে করনীয় বিষয়ক সাক্ষাৎকার টি দেখুন আজ সন্ধ্যায় অন লাইন পোর্টাল dsmbd24.com (দীপ সমাচার ময়মনসিংহ বাংলাদেশ) ও আগামীকাল সাপ্তাহিক নবকলতান পত্রিকায়।

Posted by দীপ মাদকাসক্ত পুনর্বাসন কেন্দ্র, ময়মনসিংহ on Tuesday, March 31, 2020

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *