অপ্রতিরোধ্য ইয়াবার থাবা : ছড়িয়ে পড়ছে শহর থেকে গ্রামে

কামরুজ্জামান খান : দেশে মাদকদ্রব্য হিসেবে ইয়াবার ব্যবহার যেন অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। যৌন উত্তেজনা বর্ধনকারী বড়ি ইয়াবা ট্যাবলেটের বিস্তার দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে শহর থেকে গ্রামগঞ্জ পর্যন্ত। এই নেশাদ্রব্যের প্রতি ক্রমশ আসক্ত হয়ে পড়ছে উচ্চবিত্ত থেকে নিম্নবিত্ত পরিবারের সদস্যরা। নিজেকে ‘স্মার্ট’ করতে শহর থেকে গ্রামগঞ্জের তরুণ থেকে মধ্যবয়সী লোকজনও ‘ইয়াবার স্বাদ’ নিচ্ছেন। এমনকি পিছিয়ে নেই কিশোরী ও তরুণীরা। অনেকেই ফেনসিডিল ও সিসার নেশা ছেড়ে এখন বুঁদ হচ্ছে ইয়াবার নেশায়। সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যদের চোখ ফাঁকি দিয়ে মায়ানমার থেকে কক্সবাজার, টেকনাফ, উখিয়াসহ ৪৫টি পয়েন্ট দিয়ে নৌপথে আসছে কোটি কোটি পিস ইয়াবার চালান। পরে তা নানা কৌশলে সড়কপথে ছড়িয়ে পড়ছে রাজধানীসহ সারা দেশে। প্রতিদিন বা মাসে কত পিস ইয়াবা দেশে ঢুকছে তার সঠিক হিসাব কারো কাছে না থাকলেও প্রতিদিন গড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দাদের জালে ধরা পড়ছে হাজার হাজার পিস ইয়াবা।

কক্সবাজারের রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ীদের একটি সূত্রের দাবি, কক্সবাজার ও টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে প্রতি মাসে প্রায় পৌনে দুই কোটি পিস নিষিদ্ধ ইয়াবা ট্যাবলেট আসছে। পরে তা রাজধানীসহ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। যার আনুমানিক বাজারমূল্য ২০০ কোটি টাকারও বেশি। সাগরপথ ছাড়াও প্রায় ৫৪ কিলোমিটার উন্মুক্ত মায়ানমার সীমান্তের প্রায় ৪০টি পয়েন্ট থেকে এসব ইয়াবা বাংলাদেশে ঢুকছে। সম্প্রতি নৌবাহিনী, বিজিবি, র‌্যাব, কোস্টগার্ড ও পুলিশ ইয়াবার কয়েকটি বড় চালান জব্দ করলেও রুট পাল্টে ইয়াবার চালান আসছেই।

Dip Add

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া ছাত্রছাত্রী, ব্যবসায়ী, ডাক্তার, পুলিশ, আইনজীবী, শিক্ষক, চাকরিজীবী ও শ্রমজীবীসহ প্রায় সব শ্রেণি-পেশার মানুষই ইয়াবার স্বাদ নিচ্ছে। নিষিদ্ধ এই ট্যাবলেটের ব্যবসা করে রাতারাতি কোটিপতি বনে গেছে অন্তত ৬৯ জন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তাদের তালিকা থাকলেও বেশিরভাগই অধরা।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের হিসাব মতে, চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি দুই মাসে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে ৩৭ লাখ ৪১ হাজার ৫১৭ পিস নিষিদ্ধ ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করেছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। বিজিবি, র‌্যাব, নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড, গোয়েন্দা পুলিশ, থানা-পুলিশের অভিযানে গ্রেপ্তার হয়েছে ৬৮৮ জন মাদক ব্যবসায়ী। আর এতে মামলা হয়েছে ৫৪৫টি।

সূত্র মতে, ২০০৯ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ৬৫ লাখ ১২ হাজার ৮৯৬ পিস ইয়াবা উদ্ধার করেছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। এ সময় গ্রেপ্তার করা হয় ১ হাজার ১৬৭ জন মাদক ব্যবসায়ীকে। এসব ঘটনায় মামলা হয় ৯৪৫টি। এর বাইরে চলতি বছরে প্রথম দুই মাসে ইয়াবা উদ্ধার করা প্রায় আট লাখ পিস। এর মধ্যে ২০০৯ সাল থেকে ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত প্রায় ১৭ লাখ ১০ হাজার পিস ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করেছে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। এ সময় মামলা হয়েছে প্রায় তিন হাজার ও গ্রেপ্তারের সংখ্যা প্রায় ৩ হাজার ৭শ। অন্যদিকে গত জানুয়ারি থেকে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত ৭ লাখ ৮৭ হাজার ১০৩ পিস ইয়াবা উদ্ধার করেছে র‌্যাব। এসব ঘটনায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে প্রায় ১২শ মাদক ব্যবসায়ীকে। সম্প্রতি ইয়াবার বড় চালানগুলো জব্দ করতে সফলতা দেখিয়েছে বিজিবি, নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ড সদস্যরা।

একাধিক মাদক নিরাময় কেন্দ্রের চিকিৎসক জানিয়েছেন, ইয়াবা হচ্ছে থাই শব্দ। যারা অর্থ হচ্ছে ক্রেজি বা পাগলা ট্যাবলেট। ‘ইয়া’ অর্থ ক্রেজি, আর ‘বা’ মানে হচ্ছে ট্যাবলেট। ইয়াবা হচ্ছে ব্র্যান্ড নেইম। ইয়াবা হলো মেথাফেটামাইন ও ক্যাফেইনের মিশ্রণ। মাদকটি একাধারে মস্তিষ্ক ও হƒদযন্ত্র আক্রমণ করে। এই মাদক সেবন করলে মস্তিষ্কে এক ধরনের উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়, কিন্তু তা স্থায়ী হয় না। এরপর আসে মানসিক অবসাদ। ঘুম হয় না। আচরণে ও চিন্তায় বৈকল্য দেখা দেয়। ন্যায়-অন্যায় বোধ লোপ পায়। মানুষ অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে।

র‌্যাব কর্মকর্তারা জানান, ইয়াবা সহজে বহনযোগ্য। সতর্কভাবে যে কেউ দেহে বহন করলে শরীর তল্লাশি করেও তা পাওয়া কষ্টকর। শার্ট-প্যান্টের পকেটে, মানিব্যাগের ভেতর, জুতার ভেতর এমনকি কাঠপেন্সিলের পেছনের রাবার খুলে সেখানে ইয়াবা রাখা যায়। বিস্কুটের প্যাকেটে, দিয়াশলাই বাক্সে ও নারিকেলের ভেতর থেকে ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে। তাই এটা শনাক্ত করা দিন দিন অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ছে।

এ ব্যাপারে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশে যে ইয়াবা আসছে এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে আর-৭। আর-৭-এর অন্তত ১০টি ক্যাটাগরির ইয়াবা এখন বাজারে অহরহ মিলছে। এমনকি অনেক পান-সিগারেটের দোকান, ফুটপাতের চায়ের দোকান, যারা হেঁটে চা বিক্রি করে তাদের কাছেও পাওয়া যায়। এরা সেবনকারীদের চেনে। আর-৭-এর এক নম্বর ক্যাটাগরির এক পিস ইয়াবার মূল্য প্রায় দুই হাজার টাকা। এর সর্বনিম্ন যে মূল্য রয়েছে তার এক পিস চারশ টাকা। বাজারের সবচেয়ে সহজলভ্য ইয়াবার নাম ‘চম্পা’। এর রঙ গাঢ় লাল। যার বাজারমূল্য প্রতি পিস ২৫০ থেকে ৩০০ টাকার মতো।

গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, বিভিন্ন সময় গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে শীর্ষ ইয়াবা ব্যবসায়ীদের তালিকা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। ২০১২ সালের নভেম্বরে প্রথম ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের একটি তালিকা করা হয়। ওই তালিকায় নাম ছিল ৫৫৪ জনের। সম্প্রতি বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, বিজিবি, র‌্যাব ও পুলিশ তালিকা তৈরি করেছে। এতে এবার ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২শর বেশি। কিন্তু তালিকাভুক্ত ইয়াবা ব্যবসায়ীরা বরাবরই ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে।

সূত্র জানায়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইয়াবার কারখানা, ইতিহাস, পাচারের কৌশল ও রুট সম্পর্কে একটি নথিতে উল্লেখ করেছে, ইয়াবা ট্যাবলেটের উৎপাদনস্থল হলো থাইল্যান্ড ও মায়ানমার সীমান্ত এলাকা। পূর্ব মায়ানমারের শান প্রদেশের এক সময়কার বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন ওয়া আর্মি আশির দশকে মায়ানমার সরকারের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তির পর প্রকাশ্যে ইয়াবা ট্যাবলেট উৎপাদন শুরু করে। মায়ানমারের মংডু এলাকায় ইয়াবা ট্যাবলেট তৈরির ৩৭টি কারখানায় শুধুমাত্র বাংলাদেশে পাচারের উদ্দেশ্যে ইয়াবা ট্যাবলেট তৈরি করা হয় বলে জানানো হয়। এর মধ্যে প্রতিদিন ৭টি কারখানায় ১০ লাখেরও বেশি ইয়াবা ট্যাবলেট উৎপাদন করা হয়।

র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল জিয়াউল আহসান বলেন, মাদকদ্রব্যের বিষয়ে জিরো টলারেন্স অবস্থান নিয়েছে র‌্যাব। প্রায় প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা উদ্ধার ও মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেপ্তার করছে র‌্যাব। তিনি বলেন, মাদকের ব্যাপারে প্রথমে পরিবার পরে সমাজ থেকে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। না হলে এই সামাজিক ব্যাধি দূর করা কোনোভাবেই সম্ভব হবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *