করোনা – আমাদের স্বাস্থ্যকর্মী ও মানসিক স্বাস্থ্য

ডা. পলাশ রায়:

করোনা পৃথিবীর প্রায় প্রতিটা দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার পরীক্ষা বেশ ভালো করেই নিচ্ছে। আমাদের দেশেও এই মহামারি নিকটে মনে হচ্ছে। প্রস্তুতির যথেষ্ট সময় পেয়েও আমাদের সম্যক প্রস্তুতি প্রশ্নবিদ্ধ।আমরা যারা স্বাস্থ্যকর্মী আছি তাদেরকে বলা হচ্ছে সম্মুখ সমরের যোদ্ধা, তাই প্রস্তুতি যেমনই থাক আমাদের নৈতিকতা আর পেশাগত দায়িত্বের কারনে আমাদেরকেই সামনে থাকতে হবে, আক্রান্ত ব্যক্তিদের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশে করোনা সংক্রমনের এই সময়ে আমরা সবাই পার্সোনাল প্রোটেক্টিভ ইকুইপমেন্ট এর স্বল্পতা, মানসম্মত মাস্কের স্বল্পতা কিংবা পরীক্ষার অপ্রতুলতার কথা বলছি। আমরা সংক্রমনের হার কমানোর জন্য সোশ্যাল ডিসটেনসিং এর উপড় জোর দিচ্ছি। কিন্তু আমাদের অবস্থা যদি আমেরিকা বা ইউরোপের মত হয় সেই ক্ষেত্রে সেবা যারা দিবেন তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের দিকটার কথা মনেও আনছিনা। আমাদের দেশের সংবাদ মাধ্যম যাই বলুকনা কেন স্বাস্থ্য কর্মীরা সেবা ঠিকই দিয়ে যাচ্ছেন; যাদের আস্থায় রেখেছেন দেশের সিংহভাগ জনগণ। অনিশ্চিত ভবিষ্যতকে জয় করার জন্য আমরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অক্লান্ত পরীশ্রম করে যাচ্ছি। একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ হিসাবে আমি মনে করি আমাদের এই মনোবলই হচ্ছে শেষ রক্ষাকবচ। দায়িত্বের আড়ালে সকল স্বাস্থ্যকর্মীই তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন এবং ভীত। আমার সহকর্মী, পরিবার ও বন্ধুদের সাথে কথা বলে যেটুকু বুঝেছি, সামগ্রিকভাবে সবার মধ্যেই সামনের কঠিন সময়ের মোকাবেলায় উদ্বেগের লক্ষন স্পষ্ট বিদ্যমান। আমরা জানি কঠিন সময়ের মাত্র শুরু এখন। তাই দেরি হয়ে যাবার পূর্বেই করোনা যোদ্ধাদের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি নজর দেয়া উচিত। সত্য কথা বলতে, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রী স্বাস্থ্যকর্মীদের শারিরীক ও মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় অত্যাবশ্যক। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের স্বস্থ্যকর্মীদের আক্রান্ত হওয়ার হার আমাদের উদ্বেগ আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। পিপিই ছাড়া স্বাস্থ্যকর্মী নিজেও যেমন আক্রান্ত হতে পারে তেমনি সে সুপার স্প্রেডার হিসাবে তার সংস্পর্শে আসা রোগিদের ও নিজের পরিবারের সদস্যদেরকেও সংক্রমিত করতে পারে। পরিবারের বাকী সদস্যদের সংক্রমণ ঝুঁকি কমানোর স্বার্থে আমার জানা মতে অনেকেই নিজেকে সমাজ এবং পরিবারের সংস্পর্শে আসা থেকে বিরত রাখছেন। কেউ কেউ নিজের বাড়িতেও আলাদা থাকছেন। পরিবারের সদস্যদের সাথে যথাসাধ্য দূরত্ব বজায় রেখে মিশছেন। নিজের পরিবার এবং সমাজকে সংক্রমিত না করার স্বার্থে প্রাত্যহিক জীবনের এই উল্লেখযোগ্য বিচ্যুতি কতদিন থাকবে আমরা তা জানিনা। এই সময় একাকীত্ব বোধ করা খুবই স্বাভাবিক। কোন স্বাস্থ্যকর্মী আক্রান্ত রুগীর সংস্পর্শে আসা বা নিজে পজিটিভ হওয়ার কারনে যদি কোয়ারিন্টিনে যেতে বাধ্য হন তখন তার এই ভয় এবং উদ্বেগ আরো বহুগুনে বেড়ে যায়। সার্স ইপিডেমিকের সময় করা গবেষনাগুলোতে দেখা গেছে কোয়ারেন্টিন স্বাস্থ্য কর্মীদের মানসিক স্বাস্থের উপড় বিশাল প্রভাব ফেলে। সেই সময় কোয়ারিন্টিনে থাকা অনেকের মধ্যে একিউট স্ট্রেস ডিজঅর্ডার, বিষণ্ণতার লক্ষণ, মাদক গ্রহণ এমনকি আত্মহত্যার প্রবণতাও লক্ষ্য করা গেছে। এমনকি কয়েকবছর পরেও বিশেষত কোয়ারিন্টিনে থাকা স্বাস্থ্য কর্মীদের পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডারের লক্ষণ দেখা যায়। যার ফলশ্রুতিতে অনেকে পরবর্তীতে রোগীর সংস্পর্শে আসা কমিয়ে দিয়েছেন এমনকি অনেক স্বাস্থ্যকর্মী আর কাজেই যোগদান করতে পারেননি। চীন, ইতালি বা আমেরিকাতে অনেক স্বাস্থ্যকর্মী করোনা সংক্রমণে মারা গেছেন যা আমাদের ভীতিকে আরো বাড়িয়ে তুলেছে।উপযুক্ত সুরক্ষা সরঞ্জামের অপ্রতুলতা, কোন প্রকার প্রণোদনার অভাব এবং সর্বোপরি বিভিন্ন গণমাধ্যমের অপরিনামদর্শী ও বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই অসত্য সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে স্বাস্থ্যকর্মী ও জনগনকে মুখোমুখি দাঁড় করানোর অপচেষ্টা সম্মুখ সমরের যোদ্ধাদের মনে হতাশার জন্ম দিচ্ছে। এই হতাশার কারণে কেউ কেউ নিজ সুরক্ষার নির্দেশনাগুলো উপেক্ষা করছেন যা তাদের সংক্রমণের ঝুঁকি আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে। কেউ কেউ তার পেশাকেই ত্যাগ করার চিন্তা করছেন। এই ধরনের মহামারির সময় নিজের বা পরিবারকে রক্ষার চিন্তা, চাকুরিস্থলে প্রস্তুতি ও পরিকল্পনার ঘাটতি সর্বোপরি ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তায় স্বাস্থ্যকর্মীরা মনে যে চাপ নিয়ে চলছেন তা সমাজের অন্য যে কোন শ্রেনী পেশার তুলনায় অনেক বেশী। যা তাদের মানসিক স্বাস্থের জন্য হুমকিস্বরুপ। চীনের করোনা সংক্রমনের সময়ের গবেষনাতেও এই চিত্র উঠে এসেছে। এই ক্রান্তিকালীন সময়ে করোনাযোদ্ধাদের মানসিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষার ব্যাপারে নজর দেয়া অত্যন্ত জরুরি। মহামারির কারণে মানসিক ক্ষতের প্রভাবে সৃষ্ট সমস্যা মোকাবেলায় ভবিষ্যতেও এই কার্যক্রম অব্যাহত রাখা উচিত হবে। স্বাস্থ্যকর্মী নিজেদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থের সুরক্ষায় যে বিষয়গুলার দিকে নজর দেয়া উচিত- – মৌলিক চাহিদা যেমন নিয়মিত ঘুম, সুষম খাবার গ্রহন এবং হালকা ব্যয়াম করা। – কাজের ফাকে অল্প বিরতি নেয়া। বিরতির সময় পেশার সাথে সম্পর্কযুক্ত না এমন কাজ করা। যেমন, পায়চারি করা, গান শোনা ইত্যাদি। – সহকর্মীদের সাথে আন্তরিক সম্পর্ক স্থাপন করুন। মানসিক চাপকে সহনীয় পর্যায়ে রাখার জন্য প্রয়োজনে শিথিলকরণ বা মাইন্ডফুলনেস চর্চা করুন, একে অন্যের কাছ থেকে মানসিক চাপ কমানোর জন্য সাহায্য গ্রহণ করুন। – কর্মক্ষেত্রে সহকর্মীদের কাজের প্রশংসা করুন। নিজের বা অন্যের ভুল এবং কর্মক্ষেত্রে সম্পদের অপ্রতুলতার গঠনমূলক ব্যাখ্যা চিন্তা করুন। – সম্ভব হলে প্রিয়জন বা পরিবারের সদস্যদের সাথে যোগাযোগ করুন। – সহকর্মীদের ব্যক্তিগত পছন্দ বা অপছন্দ কে সন্মান করুন। – গ্রহণযোগ্য উৎস থেকে সংবাদ সংগ্রহ করুন এবং নিজেদের মধ্যে সার্বিক পরিস্থিতি বিষয়ে আলোচনা করুন ও কর্মপরিকল্পনা ঠিক্ করুন। – সংবাদ মাধ্যমে খবর দেখা এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অংশগ্রহণ সীমিত করুন। খারাপ সংবাদ ও গুজব আপনার মনের চাপ বাড়াবে যা মানসিক স্বাস্থ্যকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে। – নিজের মধ্যে বিষণ্ণতা বা উদ্বেগজনিত রোগের কোন লক্ষণ যেমন, লম্বা সময় ধরে মন খারাপ থাকা, ঘুমের সমস্যা, ক্রমাগত দুশ্চিন্তা বা নিরাশা আছে কিনা।

Dip Add

লেখক:ডা. পলাশ রায় (এমফিল, মনোরোগ) সহকারী অধ্যাপক,মচিমহ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *