শামসুর রাহমানের কবিতা

সিকদার আমিনুল হকঃ তিরিশের কবিদের সম্মুখে পথ রোধ করে দাঁড়িয়েছিল বিশাল প্রতিভাবান একজন রবীন্দ্রনাথ; সেটা অতিক্রম করতে তাদের যে-ধরনের অমানুষিক পরিশ্রম ও নিষ্ঠার পরিচয় দিতে হয়েছিল; পঞ্চাশের এমনকি ষাটের কবিদেরও সৌভাগ্য যে, চল্লিশের কবিরা এমন কোনো প্রতিবন্ধকতার জন্ম দেন নি যে, যার জন্যে নতুন চেতনা, কিংবা ভিন্ন কোনো অঘটনের জন্ম দিতে হয়েছিলো তাদের।

তাই দেখা যায়, পঞ্চাশের বিশিষ্ট কবিরা প্রথম আত্মপ্রকাশের সময়কালে তিরিশের কারো না কারোর অতি-ঘনিষ্ঠ, প্রভাবিত এবং সম্ভবত আপাদমস্তক আক্রান্ত। পঞ্চাশের প্রধান কবিদের মধ্যে শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, হাসান হাফিজুর রহমান কিংবা শহীদ কাদরীকে কোনো না কোনোভাবে অধিকার করে আছেন জীবনানন্দ দাশ, বুদ্ধদেব বসু, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, প্রেমেন্দ্র মিত্র কিনবা বিষ্ণু দে। অবশ্য এ-কথা সত্য যে কবি মাত্রকেই আত্ম-স্বর, নিজস্ব ব্যক্তিত্ব ও স্ব-প্রজ্জ্বলনের পরিচয় দিতে হয়—কেন না একজন নতুন কবি মানেই একটি ভিন্ন পৃথিবী।

Dip Add

অবশ্য সকল কবির বেলায় কথাটা খাটে না। সকলের চিন্তাই আর ততো অগ্রসর নয়; কল্পনার আভাও ততো দূরগামী নয়—ফলে প্রভাবের মধ্যেই বিমর্ষভাবে শেষ হয় তাদের শিল্প-শ্রম। বলা উচিত হবে যে শামসুর রাহমান, যদিও প্রথম আত্মপ্রকাশের কালে তিরিশের মুগ্ধতায় সবচেয়ে আবিষ্ট ছিলেন; তিনিই তিরিশের পরে বাংলা কবিতাকে সম্মুখে অগ্রসর করতে প্রধান ভূমিকাটি পালন করেছেন। সকলেই একমত হবেন না সত্য; দুই বাংলার কবিতা সংযুক্ত করলে সে ক্ষেত্রে আরও প্রশ্ন উঠবে; তবু সমালোচক আবু সায়ীদ আইয়ুবের প্রখর দৃষ্টিতে তিরিশের পরে শামসুর রাহমানই বাংলা কবিতার প্রধান কবি।

২.

বাংলা কবিতায় শামসুর রাহমানের মতো খুব কবিই এতো বিপুল পরিমান কবিতা লিখেছেন। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতার সংখ্যাও কম নয়; তবু বিষয় বৈচিত্র্য বাদ দিলেও তা শামসুর রাহমানের কবিতাকে স্পর্শ করতে পারে নি। কালের প্রভাবে পীড়িত, বিশ্বাসে চিড় ধরা, প্রতিবাদী ও সংগ্রামী শামসুর রাহমানের পাশে শক্তি চট্টোপাধ্যায় আত্মরতিতে ক্লান্ত, নাগরিকতায় তিক্ত এবং আত্মহননে মুগ্ধ এমন একজন কবি, যার ক্রিয়াকলাপ ক্ষয় ও ক্ষরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ। তবে কবি জীবনানন্দ দাশই বলেন, ‘কবিতা অনেক রকমের’; যদি তাই হয়, আমাদের স্বীকার করে নিতে হবে একদিকে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, হুইটম্যান ও শামসুর রাহমানের মতো কবি, যার অন্যপাশে একান্ত, নির্জন ও নিঃসঙ্গ অবস্থান নিয়ে আছেন, বোদলেয়ার, র‍্যাঁবো, রিল্কে, হোয়েল্ডারলিন ও জীবনানন্দ দাশ।

শামসুর রাহমান তার শ্রেষ্ঠ কবিতার প্রথম সংস্করণের ভূমিকাতেও স্বীকার করেছেন এই দ্বৈত ভূমিকার কথাটি, ‘সবচেয়ে বড় কথা; সুদূর সৌরলোক, এই চরাচর, মানুষের মুখ, বাঁচার আনন্দ কিংবা যন্ত্রণা, সব সময় বন্দনীয় মনে হয় আমার কাছে। এসবের বন্দনা-ই কি আমার কবিতা? বলা মুশকিল; কবিতা বড় গূড়াশ্রয়ী, বড় জটিল। আমি তো জীবনের স্তরে স্তরে প্রবেশ করতে চাই, কুড়িয়ে আনতে চাই পাতালের কালি, তার সকল রহস্যময়তা। যে মানুষ টানেলের বাসিন্দা, যে মানুষ দুঃখিত, একাকী—সে যেমন আমার সহচর। তেমনি আমি হাঁটি সে সব মানুষের ভিড়ে, যারা ভবিষ্যতের দিকে মুখ রেখে তৈরি করে মিছিল’ (শামসুর রাহমানের শ্রেষ্ঠ কবিতা/সেপ্টেম্বর ১৯৭৬) অর্থাৎ শামসুর রাহমান এক কথায় খারিজ করে দিলেন, ম্যাকলীশের কবিতার এই সংজ্ঞাকে :

‘কবিতাকে হতে হবে, সমান অনন্ত

সত্য হয়ে না ওঠার মতো

… … …

কবিতা কিছুই জানাবে না, তাকে

হয়ে উঠতে হবে’।

(কবিতা প্রসঙ্গ/ আর্চিবল্ড ম্যাকলীশ)

যেহেতু এই বাংলাদেশ এবং আরো সঠিকভাবে বলতে গেলে এই উপমহাদেশই বিদেশি প্রভু দ্বারা শাসিত, সেহেতু এই অঞ্চলের কবিদের সৌন্দর্য-উপভোগেও আসে অসুন্দরের কালো ছায়া, দুঃস্বপ্নের আর্তি ও বিদ্রোহের ইচ্ছা ও বাস্তবতা। নজরুল না হয় বিদ্রোহী কবি, তার রক্তেই শেকল-ভাঙার উচ্ছ্বাস; কিন্তু রবীন্দ্রনাথ? যিনি সত্য, সুন্দর ও কল্যাণের স্পর্শে জীবনকে সার্থক করতে চেয়েছিলেন; তাকেও স্বদেশের মানুষের লাঞ্ছনা, মানব সভ্যতার প্রতি অবমাননায় ক্রুদ্ধ ও ক্ষুব্ধ হতে হয়েছে—পশ্চিমের প্রতি ঘৃণায় তাকেও উচ্চকণ্ঠ ও তীক্ষ্ণ হতে হয়েছে।

শামসুর রাহমান ব্রিটিশ শাসনের সামান্য অনাচারই দেখেছেন; যেহেতু তার জন্ম ১৯২৯ সালে, অর্থাৎ স্বাধীনতা নামে আরও একটি প্রহসনের আঠারো বছর আগে। প্রভুরই বদল হয়েছে, এই সত্যটি তির্যকভাবে উপলব্ধির উপলক্ষ হলো বাংলা ভাষা ও সে-সঙ্গে অর্থনীতিক বৈষম্যের সংকট উপলব্ধি। নিজবাসভূমে পরবাসী হওয়ার দুঃখ, পরবর্তীকালে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের অনেকটাই তার কবিতাকে প্রভাবিত, এমনকি মনোজগৎকে বিদীর্ণ করেছে বারবার। প্রেমিকার সঙ্গে তীব্র মিলনের মুহূর্তে তার মনে পড়ে যায় ‘পড়ছে বোমা ভিয়েতনামে’। তিনি বিশ্বাস করেন ‘বর্বরের দল করেছে দখল বাসগৃহ আমাদের’, তাই জনগন ‘অনাচার, অজাচার ইত্যাদির চায় প্রতিকার’।

সুধীন্দ্রনাথ দত্ত বেড়ে উঠেছেন, ‘জন্মাবধি যুদ্ধে যুদ্ধে, বিপ্লবে বিপ্লবে’, অন্যদিকে শামসুর রাহমানের প্রিয় বর্ণমালা ‘দুঃখিনীর বর্ণমালা’য় রূপান্তরিত। এমন যে, রাত্রি তাও ভেঙ্গে যায় অকস্মাৎ কুকুরের শানিত চিৎকারে’ আর শাসকের বুটের পদতলে তাকে দেখতে হয় শস্য-শ্যামল বাঙলায় ‘স্পন্দমান শুধুই কাক’। সুধীন্দ্রনাথ দত্ত তার জাগর চেতনায় আশার কোনো চিহ্নই দেখেন না এই গ্রহে, ‘অগ্রজের অটল বিশ্বাস’ তার ভেঙ্গে গেছে বাস্তবের প্রবল আঘাতে; সমাধান খুঁজে পান পৃথক প্রশ্নের এবং তাই তো নির্দ্বিধায় উচ্চারণ করেন ‘হয়তো ঈশ্বর নেই, স্বৈর সৃষ্টি আজন্ম অনাথ’— অথচ বিপরীত দিকে শামসুর রাহমান গেরিলার আগমনের আশায় উদগ্রীব দিন কাটান, বলেন :

‘ক্ষমতাকাল জঙ্গী হে প্রভুরা ভেবেছো তোমরা

তোমাদের হোমরা চোমরা

সভাসদ, চাটুকার সবাই অক্ষত থেকে যাবে চিরদিন?

মৃত এক গাধার চোয়ালে, মনে নেই ফিলিস্তিন,

দিয়েছি গুঁড়িয়ে কত বর্বরের খুলি? কত শক্তি

সঞ্চিত আমার দুটি বাহুতে, সেও তো আছে জানা। রক্তারক্তি

যতই কর না আজ, ত্রাসের বিস্তার

করুক যতই পাত্র-মিত্র তোমাদের, শেষে পাবে না নিস্তার।

(স্যামসন/দুঃসময়ের মুখোমুখি)

৩.

সদ্য মফস্বলের জীবন শেষ করে এখনকার অর্ধেক রাজধানীর স্থায়ী বাসিন্দা হয়েছি। অভিজ্ঞতা বলতে কলেজ পাঠাগারের বাঁধানো বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত ‘কবিতা’ পত্রিকা, সেই সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল খাতায় মশকো করার ফাঁকে কি করে যে নিজেই কিনে ফেলেছিলাম বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত ‘আধুনিক বাংলা কবিতা, নাভানা থেকে প্রকাশিত জীবনানন্দ দাশের ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ ও বুদ্ধদেব বসুর ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’, জানি না!

প্রচণ্ড ঝাঁকুনি খেয়েছিলাম তখন, এ-কথা স্বীকার না করে উপায় নেই। রবীন্দ্রনাথ আর নজরুলের জগত এতটাই আচ্ছন্ন করে রেখেছিল যে; তিরিশের এই সব কবিতা দরজা খুলে দিল মহাবিশ্বের। হ্যাঁ মহাবিশ্বের বটে। কারণ এরা এলিয়ট আর পাউন্ডের জগতের বাসিন্দা; যুদ্ধে যুদ্ধে বিপর্যস্ত ইউরোপের ওপর এরা বসবাস করেই ক্ষান্ত নন; বিদ্রূপ আর ঠাট্টা করছেন পড়োজমিকে; দেখেছেন হাস্যকর প্রুফককে; ফাঁপা আর সারশূন্য মানুষ দেখে নিশ্চিত বিশ্বাসে পৌঁছেছেন সে এ-পৃথিবী শেষ হলে কাৎরানিতেই হাঁক দেবার সময়টাও সে পাবে না।

হায়রে, তছনছ হয়ে গেলো এতোদিনের স্বপ্নময় পৃথিবী। বুদ্ধদেবের সম্পাদিত ‘আধুনিক বাংলা কবিতা’ পরিচয় করিয়ে দিলো আপাদমস্তক স্বাধীন ও নাস্তিক সুধীন্দ্রনাথ দত্তকে, নৈরাশ্যের উচ্চারণেই যার আনন্দ, আরও একজন অপ্রধান কবির একটি লাইন প্রবাদের মতো জ্বলজ্বল করে তখনকার চেতনা-স্রোতকে জানিয়ে দিলো এক কথা—‘এ-যুগের চাঁদ হলো কাস্তে’

একা একাই ভ্রমণ করি পথে; বেদনায় ও আর্ত-জর্জরিত অবস্থায়। তিরিশের কবিতার ভেতরে যথার্থ অর্থে ভালোভাবে প্রবেশও করেনি; আর চল্লিশের কবিতা নামে মাত্র ধারণা দিচ্ছে যে, তারা তিরিশের কবিদের পরবর্তী বংশধর—এর বেশি নয়, এত বেশি অনুজ্জ্বল আর তিরিশের দ্বারা অধিগত তারা—হটাৎ কি করে যেন হাওয়ার একটি নাম তাও চল্লিশের কোনো কবি নয়; পঞ্চাশের একজন কবি, তখনকার পূর্ববাংলার—ভেসে এলো আমার উৎসুক দৃষ্টির দরজায়। খুঁজে খুঁজে হয়রান, অথচ পাচ্ছি না সেই অতি আকাঙ্ক্ষিত গ্রন্থটি, যার নাম, ‘প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’ এবং কবির নাম খুব প্রেমে পড়ার মতো নয়, বহু শহরেই এ-নামে বহু লোক থাকতে পারে এবং আছেনও, শামসুর রাহমান।

সুমুদ্রিত ও আগাগোড়া রুচির পোশাক পরা সেই গ্রন্থটিও একদিন হাতে এসে পৌঁছল; এবং স্বীকার করতে দোষ নেই, সে-গ্রন্থ থেকেই শামসুর রাহমান দখল করে নিল আমাকে। প্রিয় কবিদের তালিকায় সংযোজিত হলো আরও একটি নাম, আরও একটি বিস্ময় এবং আরও একটি নিটোল মুগ্ধতা।

দিন নেই, রাত্রি নেই; প্রহর হেঁটে হেঁটে মধ্যরাতে পৌঁছয়, আপন আনন্দে উচ্চারণ করতে থাকি অপরূপ মাত্রাবৃত্তের দোলা :

‘শুধু দু’টুকরো শুকনো রুটির নিরিবিল ভোজ

অথবা প্রখর ধু ধু পিপাসার আঁজলা ভরানো পানীয়ের খোঁজ

শান্ত সোনালী আল্পনাময় অপরাহ্নের কাছে এসে রোজ

চাইনি তো আমি। দৈনন্দিন পৃথিবীর পথে চাহনি শুধুই

শুকনো রুটির টক স্বাদ আর তৃষ্ণার জল।… …

… … … এইটুকু ছিলো গাড় প্রার্থনা—

(রূপালি স্নান/প্র.গ্রা.দ্বি.মৃ.আ.)

সূত্রঃ বাংলা ট্রিবিউন অনলাইন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *