ইয়াবা মাফিয়াদের দখলে বিশ্বের বৃহৎ মাদক পাচার রুট

বিশেষ প্রতিবেদকঃ মায়ানমারের ৩৭ কারখানায় তৈরি ১৩ ধরনের ৩০ লাখ পিস ইয়াবা প্রতিদিন সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করে বাংলাদেশে। এছাড়াও থাইল্যান্ডে উৎপাদিত ২ ধরনের ইয়াবা মায়ানমার হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। শুধু ইয়াবা নয়, বর্তমানে এ রুটে আবার ফিরে এসেছে সিল্ক রুটের অন্যতম পণ্য হেরোইন।

মায়ানমার থেকে প্রতিদিন কেবল বাংলাদেশেই প্রায় ৩০ লাখ পিস ইয়াবা পাচার হয়। আর এজন্য মায়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্তে মায়ানমারের আটটি সংগঠন গড়ে তুলেছে ৩৭টি ইয়াবা কারখানা। মুখোশধারী চোরাচালানিদের হাত দিয়ে এসব মাদক পৌঁছে যাচ্ছে দেশের অলিতে-গলিতে। ধ্বংস হচ্ছে যুব সমাজ। বাড়ছে অনাকাঙ্খিত ঘটনা।

Dip Add

মায়ানমার সীমান্ত থেকে (টেকনাফ, কক্সবাজার): মায়ানমারের ৩৭ কারখানায় তৈরি ১৩ ধরনের ৩০ লাখ পিস ইয়াবা প্রতিদিন সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করে বাংলাদেশে। এছাড়াও থাইল্যান্ডে উৎপাদিত ২ ধরনের ইয়াবা মায়ানমার হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। শুধু ইয়াবা নয়, বর্তমানে এ রুটে আবার ফিরে এসেছে সিল্ক রুটের অন্যতম পণ্য হেরোইন। এ অবস্থা চলতে থাকলে অচিরেই বিশ্বের অন্যতম মাদক ট্রানজিটে পরিণত হবে বাংলাদেশ।

প্রতিদিন এদেশে ঢোকা ৩০ লাখ পিস ইয়াবার আনুমানিক বাজার মূল্য ৯০ কোটি টাকা। সে হিসেবে প্রতি মাসে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার ইয়াবা প্রবেশ করে বাংলাদেশে। এই ইয়াবা ছড়িয়ে পড়ে দেশের আনাচে-কানাচে। এরই মধ্যে এর বিরূপ প্রভাব শুরু হয়েছে সমাজে। যার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ বাবা-মায়ের হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত ঐশী।

আর এ বিশাল বাজার ও মাদক রুট নিয়ন্ত্রণের জন্য এরই মধ্যে পাচারকারীদের মধ্যে শক্তি সঞ্চারের প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। আর এ কারণে মাঝে মাঝেই প্রকাশ্য সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছেন মাদক ব্যবসায়ীরা।

বাংলানিউজের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কক্সবাজারের এই ইয়াবা ব্যবসা যেসব সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছে, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক এক মাফিয়া চক্রের সঙ্গে। এই মাফিয়া চক্র টেকনাফের গডফাদারদের মাধ্যমে ইয়াবা সংগ্রহ করে ছড়িয়ে দিচ্ছে পৃথিবীর অনেক দেশে।

এ কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে কক্সবাজার বিমানবন্দরসহ দেশের সকল আর্ন্তজাতিক বিমানবন্দর। সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে রয়েছে এই গডফাদারদের যোগাযোগ। মাস তিনেক আগে টেকনাফের বিতর্কিত রাজনৈতিক এক নেতা দুই তরুণীকে সঙ্গে নিয়ে তিন লাখ পিস ইয়াবা মধ্যপ্রাচ্যে নিয়ে যান বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

ক্ষমতার খুব কাছের মানুষ হওয়ায় বিতর্কিত ওই ব্যক্তিকে আটকাতে পারেনি কাস্টমস এবং ইমিগ্রেশন পুলিশ। তবে বিষয়টি চাপা থাকেনি। কক্সবাজারের প্রায় সবার কাছেই বিষয়গুলো ওপেন সিক্রেট।

কক্সবাজার প্রশাসনের এক উর্ধ্বতন কর্মকর্তা বাংলানিউজকে বলেন, বিষয়গুলো এই পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, হয়তো কিছুদিন পর আর কিছুই নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকবে না।

তিনি বলেন, প্রশাসনের প্রায় সব বিভাগই এখন ইয়াবা ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। আবার অনেকেই অনেকটা বাধ্য হয়ে জড়িয়ে পড়েছেন এই সর্বনাশা ব্যবসার সঙ্গে।

সরকারি একাধিক গোয়েন্দা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এক এক বিভাগ এক এক বিভাগকে এ ব্যবসায় সহায়তা করছে। আর এই সহায়তায় মিলছে কোটি কোটি টাকার বিলাসী জীবন ও স্থাবর সম্পদ।

সরেজমিনে জানা গেছে, টেকনাফের ইয়াবা গডফাদারদের নেতৃত্বাধীন প্রতিযোগী দলগুলো এরই মধ্যে বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে অস্ত্র সংগ্রহে নেমেছে।

একটি গোয়েন্দা সংস্থার উর্ধ্বতন কর্মকর্তা বাংলানিউজকে জানান, আমাদের কাছে তথ্য আছে, মাদক ব্যবসায়ীরা নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে ভারী অস্ত্র সংগ্রহ করছে। তাদের কাছে একে-৪৭ অস্ত্র খুবই সহজলভ্য।

তিনি বলেন, আমি আমাদের উর্ধ্বতনদের বিষয়টি জানিয়েছি। তবে এখনই বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে অচিরেই বিষয়টি ভয়াবহ রূপ নেবে। পরে বাংলাদেশ-মায়ানমার সীমান্তও আমেরিকা-মেক্সিকো সীমান্তের মতো ভয়াবহ মাদক সম্রাজ্যে পরিণত হবে।

সরকারের গোপনীয় গোয়েন্দা নথিতে দেখা গেছে, বিষয়টি নিয়ে যথেষ্ট উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। এতে আরো বলা হয়, বাংলাদেশ-মায়ানমার দুইটি বন্ধুপ্রতিম দেশ। কিন্তু ইয়াবা ব্যবসায় জড়িত অপরাধী চক্রর কর্মকাণ্ডে উভয় দেশের মধ্যে সুসম্পর্কের অবনতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ইয়াবা একটি মরণনেশা জাতীয় মাদক। যার মাধ্যমে বাংলাদেশের উঠতি বয়সের যুব সমাজ হুমকির সম্মুখীন। যার দ্রুত নিরসন বাঞ্ছনীয়।

এতে আরো বলা হয়, মায়ানমার থেকে আসা ইয়াবা কেবল বাংলাদেশই নয়, মাফিয়াদের হাত ঘুরে এখন ছড়িয়ে পড়ছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। এতে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের সম্মান ক্ষুন্ন হওয়া ও ভাবমুর্তি সংকটের ঝুঁকি বাড়ছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বাংলাদেশ-মায়ানমার সীমান্তের প্রায় ৪৩টি পয়েন্ট দিয়ে বিভিন্ন কৌশলে ইয়াবা পাচার করা হয়। এর মধ্যে টেকনাফ ও শাহপরীর দ্বীপের মধ্যবর্তী প্রায় ১৪ কিলোমিটার নাফ নদীর চ্যানেল এলাকা ইয়াবা পাচারের প্রধান রুট হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ইয়াবা চোরাচালানে ছোট নৌকা, ট্রলার, মালবাহী ছোট জাহাজ ব্যবহার করা হয়। এছাড়াও অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গা মহিলাদের গোপনাঙ্গে এবং শিশুদের মলদ্বারে বিশেষ পদ্ধতিতে পনেরশ’ থেকে দুই হাজার ইয়াবা পাচার করা হয়।

এর ৯০ শতাংশ ইয়াবাই নাফ নদী ও সাগর পথে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। আমদানি করা গাছের মধ্যে খোড়ল কেটে ও মাছের প্যাকেটের মধ্যে ইয়াবা আনা হয়। তবে গডফাদাররা এখন সরাসরি বস্তাবন্দি অবস্থায়ই ইয়াবা আনা শুরু করেছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *