করোনা চিকিৎসায় আশা জাগিয়েছে যেসব ওষুধ

অনলাইন ডেস্কঃ নভেল করোনাভাইরাসে এরই মধ্যে দেড় লক্ষাধিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। কিন্তু এ ভাইরাসের সংক্রমণ উপশমে নিশ্চিতভাবে কার্যকর কোনো ওষুধের সন্ধান এখনো মেলেনি। যদিও বিভিন্ন দেশে চিকিৎসকরা নানা ওষুধ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে ম্যালেরিয়ার ওষুধ হাইড্রোক্সি ক্লোরোকুইন। আরেকটি ওষুধের ওপর অনেকেই ভরসা করছেন, সেটি হলো রেমডেসিভির। ইবোলার চিকিৎসায় এই অ্যান্টি ভাইরাল ড্রাগটি করোনার চিকিৎসায়ও বেশ কার্যকর বলে দাবি করছেন মার্কিন চিকিৎসক ও গবেষকরা।

কার্যকর ওষুদের খোঁজে নেমেছে অনেকগুলো সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা। এরই মধ্যে দেড় শতাধিক ওষুধ নিয়ে বিশ্বব্যাপী গবেষণা চলছে। তবে বেশিরভাগই পুরনো ওষুধ। নতুন উদ্ভাবিত হাতেগোণা কয়েকটি। আগেই ভাইরাসজনিত বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধগুলোই নভেল করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে কার্যকর কিনা তা যাচাই করে দেখছেন চিকিৎসক গবেষকরা।

Dip Add

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এরই মধ্যে মোটামুটি কার্যকর প্রমাণিত ওষুধগুলোর অধিকতর পরীক্ষা নিরীক্ষার ব্যাপারে সলিডারিটি ট্রায়াল চালিয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাজ্য দাবি করছে, তারা সর্ববৃহৎ পরিসরে নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি পরীক্ষা শুরু করেছে। পাঁচ সহস্রাধিক মানুষের মধ্যে এটি পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে।

বিশ্বের একাধিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান কভিড-১৯ থেকে সেরে ওঠাদের রক্তরস (ব্লাড প্লাজমা) ব্যবহার করার চেষ্টা করছেন। এটি এখনো নিঃসন্দেহে কার্যকর প্রমাণিত হয়নি।

কোন ধরনের ওষুধ করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে ইতিবাচক ফল দিচ্ছে- এটি বুঝতে মোটাদাগে তিনটি পথে হাঁটছেন গবেষকরা। অ্যান্টি ভাইরাল ড্রাগ সরাসির আক্রান্ত শরীরে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে- এমন ধারণা থেকে এটি প্রয়োগ করে দেখা হচ্ছে।

যেসব ওষুধ রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সাময়িকভাবে শান্ত করে দেয় এমন ওষুধ ব্যবহার করা হচ্ছে গুরুতর অসুস্থ রোগীদের ক্ষেত্রে। কারণ তাদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা যদি মাত্রাতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখাতে থাকে তাহলে শরীরের মারাত্মক ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। ইমিউন ড্রাগ দিয়ে সেই ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

এরপরই রক্তে সরাসরি অ্যান্টিবডি প্রবেশ করিয়ে দেখা হচ্ছে। এটি হয় কভিড-১৯ থেকে সুস্থ হওয়া ব্যক্তির রক্ত থেকে সংগ্রহ করা হচ্ছে অথবা ল্যাবে তৈরি করা হচ্ছে। এই অ্যান্টিবডি করোনাভাইরাসকে আক্রমণ করে ধ্বংস করে দিতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে এ পদ্ধতির ভালো ফলও পাওয়া গেছে।

এখন পর্যন্ত সবচেয়ে আশাজাগানিয়া ওষুধ কোনটি সেটি সুনির্দিষ্ট করে বলা মুশকিল। তবে ইবোলার চিকিৎসায় ব্যবহৃত রেমডেসিভিরের সর্বশেষ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ফলাফল বেশ আশাব্যঞ্জক।

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব অ্যালার্জি অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিস (এনআইএআইডি) দেখেছে, এই অ্যান্টি ভাইরাল ড্রাগ প্রয়োগ করলে করোনা উপসর্গের স্থায়িত্বকাল ১৫ থেকে ১১ দিনে নেমে আসে। সারা বিশ্বের বিভিন্ন হাসপাতালের ১ হাজার ৬৩ রোগীর ওপর এ ওষুধ প্রয়োগ করে এমন ফল পাওয়া গেছে।

এনআইএআইডির প্রধান ড. অ্যান্থনি ফাউসি বলছেন, রোগীর দ্রুত সেরে ওঠার ক্ষেত্রে রেমডেসিভিরের পরিষ্কার, উল্লেখযোগ্য, ইতিবাচক প্রভাব রয়েছে।

রোগীর সেরে উঠতে সহায়তা করে রেমডেসিভির এবং এ ওষুধের কারণেই সম্ভবত অনেককে ইনটেনসিভ কেয়ার পর্যন্ত নিতে হয় না- এ তথ্য ঠিক। কিন্তু এ পরীক্ষার মাধ্যমে এটা পরিষ্কার নয় যে এ ওষুধ করোনাভাইরাসে মৃত্যু ঠেকাতে পারে কিনা।

গবেষকরা মনে করছেন, অ্যান্টি ভাইরাল ড্রাগ আক্রান্তের প্রাথমিক পর্যায়ে ভালো কাজ দেয়। আর মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছে যাওয়া রোগীর ক্ষেত্রে ভালো কার্যকর ইমিউন ড্রাগ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যেকটি ওষুধের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের সঙ্গে সলিডারিটি ট্রায়াল চালিয়ে যাচ্ছে রেমডেসিভির তার মধ্যে একটি । এই ওষুধ প্রস্তুতকারক কোম্পানি গিলিয়াডও পরীক্ষা চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।

রেমডেসিভির ব্যবহার সম্পর্কিত যুক্তরাষ্ট্রের তথ্য-উপাত্ত প্রকাশের প্রায় একই সময় চীনেও এ ওষুধ ব্যবহারের উপাত্ত প্রকাশ পেয়েছে মেডিক্যাল জার্নাল ল্যানসেটে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, চীনে এ ওষুধ কাজ দেয়নি।

তবে পরীক্ষাটি অসম্পূর্ণ ছিল। উহানে লকডাউন সফল হওয়ার কারণে চিকিৎসকরা পরীক্ষার জন্য যথেষ্ট রোগী পাননি।

চীনের সংক্রমণের শুরুর দিকে এইচআইভি/এইডসের ওষুধ ব্যবহারে ইতিবাচক ফল পাওয়ার কথা জানা গিয়েছিল। লপিনাভির এবং রিটোনাভির মিলিয়ে সেবন করলে ভালো ফল পাওয়া যায় বলে দাবি করেছিলেন চীনা চিকিৎসকরা। এ ওষুধ দুটির সমন্বিত চিকিৎসা ল্যাবরেটরিতে বেশ কার্যকর প্রমাণ হলেও রোগীর ওপর প্রয়োগ করতে গিয়ে আশাহত হয়েছেন গবেষকরা। এ ওষুধ সারিয়ে উঠতে সহায়তা করে না বা মৃত্যুর সম্ভাবনাও কমায় না।

অবশ্য ওষুধ দুটি গুরুতর অসুস্থ রোগীদের ওপর প্রয়োগ করা হয়েছিল। সম্ভবত এ কারণেই এ ওষুধ কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারেনি বলে মনে করেন অনেকে।

এরপরই এসেছে ম্যালেরিয়ার ওষুধের নাম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এ ওষুধের সলিডারিটি ও রিকোভারি দুই পরীক্ষাই চালিয়ে যাচ্ছে এবং সরাসরি সম্পৃক্ত রয়েছে।

একাধিক গবেষক বলছেন, ক্লোরোকুইন এবং এরই আরেকটি ডেরিভেটিভ হাইড্রোক্সি ক্লোরোকুইনের অ্যান্টি ভাইরাস বৈশিষ্ট্য রয়েছে এবং এটি রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সাময়িকভাবে শান্ত করে দিতে পারে। ফলে গুরুতর অসুস্থ রোগীর ক্ষেত্রে এটি ব্যবহার করা যেতে পারে বলে ব্যবস্থাপত্র দিচ্ছেন তারা। অবশ্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই ওষুধ নিয়ে অতিউৎসাহ দেখানোর কারণেই এটি বেশি আলোচনায় এসেছে। যদিও এর কার্যকারিতা নিয়ে এখনো পরীক্ষা নিরীক্ষা শেষ হয়নি।

হাইড্রোক্সি ক্লোরোকুইন ম্যালেরিয়ার পাশাপাশি রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের সমস্যায় ব্যবহার করা হয়, এর রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারার বৈশিষ্ট্যের কারণে।

গবেষণাগারে পরীক্ষায় দেখা গেছে, এ ওষুধ করোনাভাইরাসকে সংক্রমণ থেকে দমিয়ে রাখতে পারে এবং আরো বেশ কয়েকটি প্রমাণের ভিত্তিতে চিকিৎসকরা বলছেন, এটি করোনা রোগীর জন্য উপশমকারী হতে পারে।

তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, এটির কার্যকারিতার সপক্ষে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ নেই।

মৃত্যুহার কমাতে ইমিউন ড্রাগ। করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে যখন রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া দেখাতে শুরু করে তখন শরীরজুড়ে প্রদাহ সৃষ্টি হতে পারে। সংক্রমণের বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতাকে একটা সমন্বিত শক্তি হয়তো দেয় এই প্রক্রিয়া। কিন্তু এই অতিপ্রতিক্রিয়ার কারণে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মারাত্মক ক্ষতি হয়ে যেতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত মৃত্যুও হতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সলিডারিটি ট্রায়ালের মাধ্যমে মূলত ইন্টারফেরন বেটার বিষয়ে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করা হচ্ছে। এটি  কয়েক ধরনের স্ক্লেরোসিসের চিকিৎসায় এবং প্রদাহ উপশমে ব্যবহৃত হয়। ইন্টারফেরন হলো একটি রাসায়নিক গ্রুপ যেটি ভাইরাস আক্রান্ত শরীর থেকে নিঃসৃত হয়।

আর যুক্তরাজ্যের রিকভারি ট্রায়ালে ডেক্সামেথাসোনের দিকে নজর রাখা হচ্ছে। এটি এক ধরনে স্টেরয়েড যা প্রদাহ কমাতে ব্যবহৃত হয়।

কভিড-১৯ থেকে সের ওঠাদের রক্ত দিয়ে আক্রান্তদের চিকিৎসার সম্ভাবনা নিয়ে অনেকে আশাবাদী। কারণ যারা সেরে উঠছেন তাদের রক্তে এ ভাইরাসের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি হচ্ছে। এই ধরনের লোকদের রক্তরস আক্রান্তের শরীরে প্রবেশ করানোর মাধ্যমে ভাইরাস ধ্বংস করার কৌশল কাজে লাগানোর চেষ্টা চলছে। যুক্তরাষ্ট্র এরই মধ্যে ৫০০ রোগীকে এই থেরাপি দিয়েছে। কলভালসেন্ট প্লাজমা নামের এই থেরাপি এখন অন্যান্য দেশেও ব্যবহারের চেষ্টা চলছে।

তবে কোন ওষুধ করোনাভাইরাসে বিরুদ্ধে কার্যকর এটি এখনই বলা সম্ভব নয়। কারণ ওষুধগুলোর ট্রায়াল চলছে মাত্র কয়েক মাস ধরে। কার্যকারিতা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পেতে হলে আরো কয়েক মাস ট্রায়াল চালিয়ে যেতে হবে। আর ভ্যাকসিনের ব্যাপারে আরো বেশি সতর্কতার প্রয়োজন। ওষুধ ব্যবহারের ক্ষেত্রে তেমন বিধিনিষেধ নেই কারণ এগুলো করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের অনেক আগেই নিরাপদ প্রমাণিত। আর ভ্যাকসিন সম্পূর্ণ নতুন জিনিস।

তবে আশার কথা হচ্ছে, বেশিরভাগ আক্রান্তের মধ্যে মৃদু উপসর্গ দেখা যাচ্ছে এবং বাড়িতে বিশ্রামে থেকে প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ সেবন ও প্রচুর তরল খাবার খেলেই সেরে যায়। যাদের অবস্থা গুরুতর হচ্ছে তাদের হাসপাতালে নিয়ে আইসিইউতে ভর্তি করাতে হচ্ছে। বেশিরভাগেরই অক্সিজেন দেয়ার প্রয়োজন পড়ে, কিছু সংখ্যক রোগীর কৃত্রিম শ্বাসপ্রশ্বাসের (ভেন্টিলেটর) সহায়তাও নিতে হচ্ছে।

বিবিসি অবলম্বনে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *